Tuesday, 01 September 2026 | সোমবার, ২০২৬ আগস্ট ৩১, ০৯:৪৪ পূর্বাহ্ন

জ্বালানি সংকটে ব্যয় বাড়ছে শিল্পে, প্রভাব পড়ছে পণ্যে
Tahmina Israt

বিশ্ববাজারের অস্থিরতা, স্থানীয়ভাবে জ্বালানির অপ্রতুলতার কারণে সংকটে পড়েছে দেশের শিল্প খাত। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহের অভাবে কারখানার উৎপাদন প্রক্রিয়া স্বাভাবিক রাখতে বিকল্প ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে শিল্প মালিকদের। ফলে উৎপাদন খরচ অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা শেষ পর্যন্ত পণ্যের চূড়ান্ত দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে। 

দেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাকসহ ভারী শিল্প যেমন-ইস্পাত, সিমেন্ট, সিরামিক এবং প্রক্রিয়াজাত খাদ্য খাতের উদ্যোক্তারা এ পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন। দেশের শিল্পাঞ্চলগুলো বিশেষ করে গাজীপুর, সাভার, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম ও ময়মনসিংহে গড়ে ওঠা শিল্পকারখানাগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। হঠাৎ করে ভোল্টেজ ড্রপ বা লোডশেডিংয়ের কারণে আধুনিক ও স্পর্শকাতর যন্ত্রপাতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিকল্প ব্যবস্থায় বাড়তি ব্যয়ের খাতসমূহ উৎপাদন ব্যবস্থা যেন পুরোপুরি স্থবির হয়ে না পড়ে, সেজন্য উদ্যোক্তারা ব্যয়বহুল বিকল্প পথ বেছে নিতে বাধ্য হচ্ছেন। এসব বিকল্প ব্যবস্থার কারণে উৎপাদনে সরাসরি ব্যয়ের চাপ বাড়ছে। অনিয়মিত বিদ্যুৎ ও কম চাপের গ্যাসের কারণে সংবেদনশীল টেক্সটাইল ও ডাইং কারখানার মালামাল নষ্ট হচ্ছে। পর্যাপ্ত জ্বালানির অভাবে অধিকাংশ কারখানা তাদের পূর্ণ সক্ষমতায় চালাতে পারছে না। কিন্তু কারখানার নির্ধারিত নির্দিষ্ট খরচ যেমন শ্রমিকের বেতন, ভবনের ভাড়া ও ব্যাংক ঋণের কিস্তি অপরিবর্তিত থাকছে। ফলে প্রতি একক পণ্য উৎপাদনের গড় খরচ অনেকটাই বেড়ে যাচ্ছে। উদ্যোক্তাদের আশঙ্কা গ্লোবাল সাপ্লাই চেইনে বাংলাদেশের মূল প্রতিযোগী দেশগুলোর বিপরীতে দেশের তৈরি পোশাক এবং অন্যান্য রপ্তানি পণ্য প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা হারাচ্ছে। অনেক কারখানা নির্ধারিত রপ্তানি সূচি রক্ষা করতে পারছে না।

বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) নির্বাহী সভাপতি এবং বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের সভাপতি ফজলে শামীম এহসান ইত্তেফাককে বলেন, চলমান গ্যাস-সংকটে বিদ্যমান রপ্তানি আদেশ সময়মতো শিপমেন্ট করা যাচ্ছে না।

গ্যাস-সংকটে সরাসরি ক্ষতির পাশাপাশি সবচেয়ে বড় আশঙ্কা তৈরি হয়েছে ভবিষ্যতের রপ্তানি আদেশ নিয়ে। কারখানা উৎপাদন করতে না পারলেও শ্রমিকের বেতন, ব্যাংক ঋণের কিস্তি ও অন্যান্য ব্যয় বহন করতে হচ্ছে। এতে উদ্যোক্তারা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন। সংকট মোকাবিলায় সরকারের কাছে কয়েকটি দাবি তুলে ধরা হয়েছে বিকেএমইএর পক্ষ থেকে। এর মধ্যে রয়েছে জুন ও জুলাই মাসের গ্যাস-বিদ্যুৎ বিল আগামী ১২ মাসে কিস্তিতে পরিশোধের সুযোগ দেওয়া, বিল পরিশোধে ব্যর্থতার কারণে গ্যাস বা বিদ্যুৎ-সংযোগ বিচ্ছিন্ন না করা এবং গ্যাস পরিস্থিতি নিয়ে সরকার বা পেট্রোবাংলার পক্ষ থেকে প্রতি সপ্তাহে নিয়মিত ব্রিফিং করতে হবে। এছাড়া অবৈধ গ্যাস-সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার পাশাপাশি গণপরিবহন ছাড়া অন্যান্য খাতে সিএনজির পরিবর্তে এলপিজি ব্যবহারে উত্সাহিত করার ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়। ব্যাংক ঋণের বিষয়ে বিকেএমইএ নির্বাহী সভাপতি বলেন, গ্যাস-সংকটের কারণে যেসব প্রতিষ্ঠান কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থ হবে, তাদের অন্তত ছয় মাস খেলাপি বা শ্রেণীকৃত ঋণ হিসেবে বিবেচনা না করার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতি অনুরোধ জানানো হয়েছে। ভবিষ্যতে গ্যাসের আমদানিনির্ভরতা বিবেচনায় স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। শিল্পায়নের ভবিষ্যৎ নিয়ে সরকারকে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা দিতে হবে। গ্যাসের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে বিকল্প জ্বালানি, সৌরবিদ্যুৎ বা অন্য কোনো উৎস শিল্পকে নেওয়া হবে কি না, সে বিষয়ে সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত প্রয়োজন।

কপিরাইট © 2026 jibonkantho.com